‘আর অভিনয় করতে পারবো কি না বলা মুশকিল’

prabir-mitraবাংলা চলচ্চিত্রের রঙিন নবাব খ্যাতি নিয়ে এখনো মানুষের হৃদয়ে থাকা মানুষটির নাম প্রবীর মিত্র। বর্ষীয়ান শক্তিমান এ অভিনেতা প্রায় চার যুগ ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছেন। স্কুলে পড়া অবস্থায় জীবনে প্রথমবারের মতো রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন তিনি। চরিত্র ছিল প্রহরী।

এরপর পুরনো ঢাকার লালকুঠিতে শুরু হয় তার নাট্যচর্চা। পরিচালক এইচ আকবরের হাত ধরে ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। এরপরে অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন। ‘চাবুক’সহ বেশ কিছু ছবিতে নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তবে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ ছবির জন্য তাকে বাংলার মানুষ মনে রাখবে আরও অনেক অনেক বছর।

কয়েক বছর থেকেই অনেকটা আড়ালে আছেন ৭৭ বছর বয়সী অভিনেতা প্রবীর মিত্র। বার্ধক্যও হয়েছে কাজের প্রতিবন্ধক। ফোনে আজকাল আর কথা বলতে আগ্রহ পান না। তাই সোমবার বৈশাখের মেঘমেদুরে দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় সোজা তার ফ্ল্যাটে গিয়েই সাক্ষাৎ মিললো তার। ডোরবেল বাজাতেই দরজা খুললো।

তিনি বের হয়ে আসলেন লাঠিতে ভর করে। অসুস্থতা নিয়েও বেশ হাসি মুখেই কথা বলছিলেন মেধাবী এই মানুষটি। চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলা লোক দেখলেই খুশি হন। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপে জানালেন আবারও অভিনয়ে ফেরা না ফেরা, নানা অভিমান আর বর্তমান চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তার ভাবনার কথা। সেই আলাপের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

কেমন আছেন?
প্রবীর মিত্র: মোটামুটি ভালো। হাঁটুর ব্যথাটা গরমকালে বেশি বেড়ে যায়। ব্যথা বেড়ে গেছে। চলতে ফিরতে কষ্ট হচ্ছে। আজকাল তেমন একটা বাসার বাইরে যাওয়া হয় না। মানে যেতে পারি না। বয়স হলে মনে হয় এই রকম হয়। তবে আমি শারীরিকভাবে ভালো আছি। শরীরে তেমন কোনো সমস্যা নেই। শুধু হাঁটুর ব্যথার জন্য চলে ফিরে বেড়াতে কষ্ট হচ্ছে।

ডাক্তাররা কি বলছেন?
প্রবীর মিত্র: নিয়মিত চিকিৎসার ওপরে থাকতে হচ্ছে। এটা হয়তো আর পুরোপুরি ভালো হবে না। যতদিন বেঁচে আছি ওষুধ খেয়ে যতটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়! বাধ্য হয়ে এক রকম বিশ্রামেই থাকতে হচ্ছে। সারাজীবন চলচ্চিত্র চলচ্চিত্র করে নিজের ওপর তো কম প্রেশার দেইনি। এই বয়সে একটু ভোগান্তি থাকবে বৈকী!

চলচ্চিত্রের মানুষদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান এফডিসি। মাঝে মধ্যে এফডিসিতে যেতে ইচ্ছে করে না আপনার?
প্রবীর মিত্র: এফডিসিতে আসলে কাজ থাকলেই যাওয়া হয়, কাজ না থাকলে তো যাই না। অনেক দিন হলো কাজের সঙ্গে আমি নেই। তাই যাওয়াও হয় না এফডিসি। এখন তো মনে হয় কাজও হয় কম সেখানে। শুনেছি বিভিন্ন ফ্লোরে সিনেমার শুটিংয়ের চেয়ে টেলিভিশনের শুটিংই বেশি হয়। তবে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মিস করি। ক্যামেরা, লাইট- এসব মিস করি খুব।

সবশেষ অভিনয় কবে করেছিলেন?
প্রবীর মিত্র: কয়েক মাস আগে একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলাম। সরকারি অনুদানের চলচ্চিত্রটির নাম ছিল ‘বৃদ্ধাশ্রম’। শুনেছি মুক্তির অপেক্ষায় আছে চলচ্চিত্রটি। মুক্তি পাবে হয়তো শিগগিরই। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা কণ্ঠশিল্পী এসডি রুবেল। অনেকদিন যোগাযোগ নেই তার সঙ্গে। ছবিটির বর্তমান অবস্থা সেই ভালো বলতে পারবে।

এখন কি আর অভিনয় করার মতো অবস্থায় নেই?
প্রবীর মিত্র: পায়ের যে অবস্থা আর কখনো অভিনয় করতে পারবো কি-না বলা মুশকিল। কিন্তু মন তো আসলে চলচ্চিত্রেই পড়ে থাকে। ইচ্ছে তো করে অভিনয়ে ডুবে থাকতে। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন ফিরতে পারি। আমি মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত অভিনয় করে যেতে চাই।

এখন তো বাসাতেই বেশি সময় কাটাতে হচ্ছে। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়? বিশেষ করে আপনার প্রথম চলচ্চিত্র ‘জলছবি’ ছবির গল্প ও সংলাপ লিখেছিলেন আপনার স্কুল জীবনের বন্ধু এটিএম শামসুজ্জামান। তার সঙ্গে দেখা হয় এখন?
প্রবীর মিত্র: একটা সময় মানুষ মনে হয় খুব একা হয়ে পড়ে। আমিও তাই হয়েছি। একসময় কতো মানুষের ভিড়ে থাকতাম। কতো হৈ চৈ হতো। সব এখন শান্ত হয়ে এসেছে। কারো এখন সময় নেই বৃদ্ধের সঙ্গে গল্প করার। কতজনের সঙ্গেই দেখা হয় না অনেক দিন ধরে। এটিএম শামসুজ্জামানের সঙ্গেও দেখা হয় না। এক সময় প্রচুর চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছে সে। লেখালিখিও করেছে বেশ। তবে যতদূর জানি এখন চলচ্চিত্রে সেও অভিনয় করছে কম। টুকটাক নাটকে অভিনয় করে।

আরেকটি বিষয় জানতে চাচ্ছিলাম। অনেকদিন থেকে অসুস্থ হয়ে আছেন আপনি? ইন্ডাস্ট্রি থেকে কোনো সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন?
প্রবীর মিত্র: না। আজকাল কেউ যোগাযোগও করে না। এতগুলো বসন্ত কাটালাম যে চলচ্চিত্রের সঙ্গে আজ সেখানেই কেমন জানি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়লাম। রিটায়ার্ড করলে বা কাজের শক্তি না থাকলে বুঝি আর কোনো দাম নেই। কিন্তু শিল্পচর্চার জায়গাটিতে এমন হবার কথা ছিলো না।

সরকারের কোনো সহযোগিতা পেয়েছেন?
প্রবীর মিত্র: না। আমি আসলে সরকারের কোনো সহযোগিতা নেওয়ার চেষ্টা করিনি। এগুলোতো নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়। আমি তো নিজে চাইতে পারি না। আছি নিজের মতো, স্রষ্টা যেমন রেখেছেন।

একটু প্রসঙ্গ পাল্টাই, একজন অভিজ্ঞ অভিনেতা হিসেবে যদি বলতেন, আমাদের এই সময়ে চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় সংকট কী?
প্রবীর মিত্র: আগে সময় পেলে কাকরাইল ফিল্ম পাড়ায় যাওয়া হত। অনেক আড্ডা হত। ফিল্ম পাড়ার নানা বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা চলতো। এখন সেটা আর পারিনা। অনেক দিন থেকেই আড়ালে আছি। আমার তো এখন চলচ্চিত্রের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই। আমার খোঁজ কেউ রাখে না আর আমি চাইলেও কারো খোঁজ রাখতে পারি না। যারা এখন জড়িয়ে আছে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে তারাই ভালো বলতে পারবে এ ব্যাপারে। আমি শুধু জেনেছি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভালো সিনেমা নেই। দর্শকও নেই।

এখন অনেক যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে জানেন?
প্রবীর মিত্র: হ্যাঁ জানি। এগুলো নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনাও শুনেছি আগে। যৌথ প্রযোজনা আসলে দুটি দেশের সুবিধার জন্য খরচ করা হয়েছিল। যাতে একটি সিনেমার বিগ বাজেটের খরচটা দুই প্রযোজকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এতে প্রয়োজকদের ওপর চাপটা কম পড়ে। কিন্তু আমার মনে হয় বর্তমান সময়ের যৌথ প্রযোজনার চলচ্চিত্রে আমরা খুব বেশি লাভবান হচ্ছি না। কলকাতার প্রযোজকরা বেশি লাভবান হচ্ছে আমাদের চেয়ে। ওপারের সিনেমা এপারের হলে চালানোটাই প্রাধান্য পাচ্ছে বলে মনে হয়।

কলকাতা ও বাংলাদেশের এক হয়ে কাজ করাটা আপনি কীভাবে দেখেন?
প্রবীর মিত্র: দেখেন, এক হয়ে তো কাজ ভালো হয় না। কম্প্রোমাইজ করে করতে হয়। আরেকটি বিষয় হলো বৈষম্য থেকেই যাচ্ছে।

চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার একটি ইচ্ছের কথা জানতে চাই।
প্রবীর মিত্র: চলচ্চিত্র নিয়ে যাদের প্রতিটা দিন কাটছে। দেশের চলচ্চিত্র নিয়ে যারা স্বপ্ন দেখেন, যারা চলচ্চিত্রকে ভালোবাসেন তারা সবাই যেনো ভালো থাকে। শেষ জীবনে কাউকে যেন কষ্ট পেতে না হয়, ভুগতে না হয়।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- মাসুম আওয়াল, সৌজন্যে- জাগো নিউজ