বুধবার । মার্চ ৪, ২০২৬
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু মতামত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:১৮ অপরাহ্ন
শেয়ার

১৯৪৭ থেকে ২০২৬: জামায়াতে ইসলামীর প্রতিশ্রুতি, বিতর্ক ও রাজনৈতিক বয়ানের বিবর্তন


Dulu bhai

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী একটি দীর্ঘকালীন ও বিতর্কিত শক্তি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যন্ত দলটির অবস্থান, বক্তব্য ও কৌশল নিয়ে নানা সমালোচনা, পাল্টা ব্যাখ্যা এবং ঐতিহাসিক বিতর্ক রয়েছে। এই লেখায় অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্য—দুই দিক বিবেচনায় দলটির রাজনৈতিক বয়ান ও কৌশলের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করার চেষ্টা থাকছে।

পাকিস্তান পর্ব (১৯৪৭–১৯৭১): মতাদর্শ বনাম জাতীয়তাবাদ
উপমহাদেশ বিভাজনের পর পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত হলে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানভিত্তিক ইসলামী রাজনৈতিক কাঠামোর পক্ষে অবস্থান নেয়। দলটির আদর্শিক ভিত্তি গড়ে ওঠে আবু’ল আলা মওদুদী এর চিন্তাধারায়।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ওঠে—বিশেষ করে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতার প্রশ্নে। এই অভিযোগ পরবর্তীতে যুদ্ধাপরাধ বিচারের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় আসে।

১৯৭১–২০১৩: বিচার, বিতর্ক ও আইনি রায়
স্বাধীনতার পর জামায়াত কিছু সময়ের জন্য নিষিদ্ধ থাকলেও পরবর্তী দশকে রাজনীতিতে ফিরে আসে। ২০০৯ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয় International Crimes Tribunal-এর মাধ্যমে। একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে রায় হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, আবদুল কাদের মোল্লা, দেলোয়ার হোসেন সাঈদী প্রমুখ।

২০১৩ সালে হাইকোর্ট জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের অযোগ্য ঘোষণা করে, যুক্তি ছিল দলটির গঠনতন্ত্র সংবিধানের কিছু মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই রায়ের ফলে দলটির সরাসরি নির্বাচনী অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হয়।

সমালোচকদের মতে, এ সময় দলটি রাজনৈতিক বয়ানে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে—অতীত ভূমিকা নিয়ে সরাসরি আত্মসমালোচনার বদলে আইনি ও রাজনৈতিক যুক্তি সামনে আনে। অন্যদিকে দলটির সমর্থকেরা দাবি করেন, বিচার প্রক্রিয়া ছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। বিতর্ক এখানেই।

জোট রাজনীতি ও নির্বাচনী কৌশল
২০০১ ও ২০০৮ সালে জামায়াত জোটভিত্তিক নির্বাচনে অংশ নেয়। ভোটের হার তুলনামূলক কম হলেও নির্দিষ্ট আসনে সংগঠিত সমর্থনের কারণে আসন পেতে সক্ষম হয়। সমালোচকদের ভাষায়, এটি ছিল কৌশলগত সমঝোতা; সমর্থকদের মতে, এটি ছিল গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের স্বাভাবিক রূপ।

ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ব্যবস্থায় জাতীয় ভোট শতাংশ ও আসনসংখ্যা সরাসরি সমানুপাতিক নয়। ফলে জোট রাজনীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার একটি বাস্তব কৌশল হয়ে দাঁড়ায়।

প্রচার ও জনমত: ভাষার রাজনীতি
ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক বয়ান গঠনে সামাজিক মাধ্যম বড় ভূমিকা রাখে। জামায়াতসহ বিভিন্ন দলই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সমর্থন সংগঠিত করে। সমালোচকদের অভিযোগ—ধর্মীয় আবেগ, পরিচয় রাজনীতি এবং নির্বাচিত তথ্য ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করা হয়।
অন্যদিকে দলটি দাবি করে তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার প্রয়োগ করছে। কিন্তু তথ্য-যাচাইহীন প্রচার বা উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা গণতান্ত্রিক পরিবেশে বিভাজন বাড়াতে পারে—এটি কেবল একটি দলের নয়, সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির সমস্যা।

২০২৬: পুনর্গঠন নাকি পুনরাবৃত্তি?
২০২৬ সালে এসে প্রশ্ন দাঁড়ায়—জামায়াতে ইসলামী কি তার রাজনৈতিক বয়ান ও সংগঠন কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে? দলটি দাবি করে তারা সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে রাজনীতি করতে চায়। সমালোচকেরা বলেন, অতীতের স্পষ্ট আত্মসমালোচনা ও নীতিগত রূপান্তর ছাড়া আস্থার সংকট কাটবে না।

রাজনীতিতে আস্থা তৈরি হয় তিনটি জিনিসে-
১. অতীতের দায় স্বীকারে স্বচ্ছতা
২. বর্তমান নীতিতে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি
৩. সহিংসতা ও বিভাজন থেকে স্পষ্ট দূরত্ব
এই মানদণ্ডে যেকোনো দলকেই মূল্যায়ন করতে হবে।

১৯৪৭ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিতর্কিত অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা, যুদ্ধাপরাধের বিচার, নিবন্ধন বাতিল, জোট রাজনীতি—সব মিলিয়ে দলটির পথচলা জটিল।

সমালোচনার ভাষায় এটিকে ‘প্রতারণা ও মিথ্যাচারের রাজনীতি’ বলা হয়; সমর্থকেরা একে মতাদর্শিক সংগ্রাম হিসেবে দেখেন। সত্য সম্ভবত মাঝখানে—ইতিহাসের বিচার দলিল, রায় ও নীতির ভিত্তিতেই হবে।

গণতন্ত্রের শক্তি হলো জবাবদিহি। যে কোনো রাজনৈতিক শক্তি—সে জামায়াত হোক বা অন্য কেউ—তার বৈধতা টিকে থাকে কেবল স্বচ্ছতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও জনগণের আস্থার ওপর।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি প্রশ্নে: রাজনৈতিক দলগুলো কি অতীতের বিতর্ককে স্পষ্টভাবে মোকাবিলা করে নতুন আস্থা তৈরি করতে পারবে? নাকি পুরনো বিভাজনই বারবার ফিরে আসবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে ২০২৬–এর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে এগোবে।

ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]