শুক্রবার । জানুয়ারি ১৬, ২০২৬
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ফিচার ৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১:০৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

প্রয়াণ দিবসে স্মরণ

মধ্যবর্তী এক বাস্তব নায়ক জাফর ইকবাল


Zafar Iqbal Cover

আইকনিক হিরো জাফর ইকবাল

একটা সময় ছিল, যখন বাংলা সিনেমার নায়ক মানে শুধু ফর্মুলানির্ভর গল্পের নায়ক নয়, বরং নায়কেরা ছিলেন দর্শকের ফ্যাশন-ভাবনার কেন্দ্র, স্টাইলের অনুপ্রেরণা, আর স্বপ্ন দেখার মানুষ। সত্তর, আশি ও নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিক পর্যন্ত-সেই সময়ের অন্যতম উজ্জ্বল নাম নায়ক জাফর ইকবাল। তিনি এমন একজন নায়ক, যাঁকে দেখে দর্শক শুধু ছবি দেখেনি—তাঁকে নিজের মতো করে কল্পনা করেছে, আপন মানুষ ভেবেছে।

জাফর ইকবালের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর স্বাভাবিক উপস্থিতি। তিনি কখনোই অতিনাটকীয় বা মেলোড্রামাটিক ছিলেন না। চোখের চাহনি, হাঁটার ভঙ্গি, কথা বলার ধরন—সবকিছুতেই ছিল একটা সাবলীলতা। এই স্বাভাবিকতাই তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।

জাফর ইকবাল শুধু অভিনয়ের জন্য নয়, স্টাইল আইকন হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয় ছিলেন। লম্বা চুল, ক্লিন শেভ বা হালকা দাড়ি, ডেনিম জ্যাকেট, সাদা শার্ট, সানগ্লাস—এই সবকিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন একেবারে আধুনিক শহুরে যুবকের প্রতিচ্ছবি।

সেই সময়ের তরুণদের মধ্যে তাঁর হেয়ারস্টাইল, পোশাক আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ছিল ব্যাপকভাবে অনুকরণীয়। অনেকেই সিনেমা দেখে তাঁর মতো করে চুল কাটত, শার্ট পরত, কথা বলার ভঙ্গি আয়ত্ত্ব করার চেষ্টা করত। তিনি প্রমাণ করেছিলেন—নায়ক হতে হলে শুধু শক্ত গলা বা মারদাঙ্গা ভাবই লাগে না; স্টাইল, নরম ভাব আর রোমান্টিক উপস্থিতিও নায়ক বানাতে পারে।

Zafar Iqbal Inner

জাফর ইকবালের ক্যারিয়ারে ‘নয়নের আলো’ (১৯৮৪) একটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা। এই ছবিতে তাঁর অভিনয়ে ছিল গভীর আবেগ, কিন্তু সেটা প্রকাশ পেয়েছে খুব শান্ত ও সংযতভাবে। চোখের ভাষায় প্রেম, কষ্ট আর আশার গল্প বলার ক্ষমতা তাঁর ছিল অসাধারণ।

এই সিনেমায় তিনি প্রমাণ করেন, সংলাপ কম বলেও চরিত্রকে শক্তিশালী করা যায়। দর্শক তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতে পারে—ভেতরে কী চলছে। এটাই ছিল জাফর ইকবালের অভিনয়ের বড় গুণ। এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’ গানে তাঁর করুণ অভিব্যক্তি ও ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’ গানে তাঁর রোমান্টিকতা তাঁর ভার্সেটাইলিটির প্রমাণ।

আবার, ‘আপন পর’, ‘অবদান’, ‘ভাই বন্ধু’—এই সিনেমাগুলোয় জাফর ইকবাল ছিলেন একেবারে ঘরের ছেলে। রোমান্টিক নায়ক হলেও এখানে তিনি শুধুই প্রেমিক নন, তিনি ভাই, বন্ধু, আপনজন।

এই ধরনের ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল খুব সহজ, খুব কাছের। দর্শকের মনে হতো—এই মানুষটা আমাদেরই কারও মতো। হয়তো পাশের বাড়ির ছেলে, কিংবা পাড়ার বড় ভাই। এই আপন হয়ে ওঠার ক্ষমতাই তাঁকে জনপ্রিয় করেছিল। ‘আপন পর’ সিনেমায় ‘যারে যাবি যদি যা’ কিংবা ‘ভাই বন্ধু’ সিনেমায় ‘ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা’ গানগুলোতে ভিন্ন দুরকম প্রেক্ষাপটেই তাকে যথেষ্ট মানানসই মনে হয়।

তিনি কখনো চরিত্রকে ভারী করে তোলেননি। বরং সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবেগ, দায়িত্ব—সবকিছু খুব সাধারণ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

আবার, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘প্রেমিক’, ‘যোগাযোগ’,’চোরের বউ’, ‘অবুঝ হৃদয়’ এর মতো সিনেমাগুলোতে কখনো প্রেমিক তরুণ, কখনো গম্ভীর পুরুষের দ্বৈতসত্ত্বায় তিনি নিজেকে খুব ভালোভাবেই মেলে ধরেছেন।

জাফর ইকবালের অভিনয় ছিল সংযত কিন্তু গভীর। তিনি কখনো অকারণে চিৎকার করেননি, অতিরিক্ত এক্সপ্রেশন দেননি। বরং পরিস্থিতির ভেতর ঢুকে অভিনয় করতেন।

রোমান্টিক দৃশ্যে তাঁর চোখ ছিল নরম, কণ্ঠ ছিল স্থির। দুঃখের দৃশ্যে তিনি কান্না নয়, নীরবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই সংযমই তাঁকে আলাদা করেছে।

জাফর ইকবালের আরেকটি বড় পরিচয়—তিনি ভালো গান গাইতে পারতেন। বাংলা সিনেমায় এমন নায়ক খুব বেশি ছিলেন না, যাঁদের গলার আলাদা স্বকীয়তা আছে।

তাঁর কণ্ঠ ছিল আবেগপূর্ণ, একটু ঘন, কিন্তু খুব মোলায়েম। প্রেমের গান হোক বা বেদনার—সবখানেই তাঁর গলায় একটা বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল।

‘যেভাবেই বাঁচি, বেঁচে তো আছি’-এই গানটা শুধু গান নয়,এটা এক ধরনের জীবনদর্শন। জাফর ইকবালের কণ্ঠে গানটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। ক্লান্ত জীবন, হতাশা, তবু টিকে থাকার গল্প—সবকিছুই যেন তাঁর গলায় পাওয়া যায়।

‘সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী’- এক নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গান। প্রেমিক নিজে কষ্টে থেকেও প্রিয় মানুষটির সুখ কামনা করছে। জাফর ইকবালের গলায় এই গান খুব সংযত, খুব পরিণত শোনায়।

‘হয় যদি বদনাম হোক আরো’-তে রয়েছে প্রতিবাদ, আত্মসম্মান আর প্রেমের জেদ।

‘প্রেমের আগুনে’- গানে আছে তরুণ বয়সের উচ্ছ্বাস, প্রেমের তীব্রতা। জাফর ইকবাল এখানে শুধু গায়ক নন—নায়ক হিসেবে তিনি চরিত্রটাকেও বয়ে নিয়ে যান।

Zafar Iqbal Inner 2

‘শেষ করো না শুরুতে খেলা’- গানটিও প্রথম রেকর্ড করেন জাফর ইকবাল, কিন্তু সেই রেকর্ডটি এখন আর পাওয়া যায়না।

সবমিলিয়ে, জাফর ইকবাল কোনো একক ঘরানার নায়ক ছিলেন না। তিনি মারদাঙ্গা নায়কও নন, আবার অতিরিক্ত সফট রোমান্টিকও নন। তিনি ছিলেন মধ্যবর্তী এক বাস্তব নায়ক—যার ভেতরে আছে প্রেম, দায়িত্ব, দ্বন্দ্ব আর স্বপ্ন।

তিনি এমন এক সময়ের প্রতিনিধি, যখন নায়করা দর্শকের কাছে শুধু পর্দার মানুষ ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন আদর্শ, কল্পনার বন্ধু।

আজকের দিনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, জাফর ইকবালের মতো নায়কের বড় অভাব রয়েছে। তাঁর অভিনয়ে ছিল শান্ত আত্মবিশ্বাস, স্টাইলে ছিল রুচি, আর কণ্ঠে ছিল আবেগ।

তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন—নায়ক মানে শুধু শক্তির প্রদর্শনী নয়, সংবেদনশীলতার প্রকাশও।

জাফর ইকবাল ছিলেন এক সময়ের বাংলা সিনেমার আলো-হাওয়া। তাঁর ফ্যাশন সেন্স, অভিনয় আর গানের কণ্ঠ—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন পূর্ণাঙ্গ এক শিল্পী। সময় বদলেছে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, কিন্তু তাঁর কাজগুলো আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।কারণ তিনি শুধু নায়ক ছিলেন না—দর্শকের কাছে তিনি ছিলেন এক গভীর অনুভূতির নাম।