
দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব ও ইরানের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে পাকিস্তান
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ তীব্রতর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল ও লেবাননজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাপে পড়েছে—তাদের এখন একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার দাবি উঠছে।
দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব ও ইরানের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে পাকিস্তান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ইসলামাবাদ ভূমিকা রাখলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নিরপেক্ষ অবস্থান কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, আফগানিস্তান সীমান্তে তালেবানের সঙ্গে চলমান সংঘাত, বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে বিদ্রোহ, এবং ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে নতুন করে অস্থিতিশীলতায় জড়ানোর ঝুঁকি নিতে পারছে না পাকিস্তান। এ অবস্থায় উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো যখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করছে, তখন উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ইসলামাবাদ।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তান কেবল ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করে একটি মৃদু বিবৃতি দেয়, সরাসরি নিন্দা জানায়নি। তবে বিপরীতে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার ক্ষেত্রে পাকিস্তান দ্রুতই ‘নিন্দা’ জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সমালোচনা করতে পাকিস্তানের অনীহার একটি বড় কারণ হলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প ইরান বিষয়ে পাকিস্তানের ওপর নির্ভর করছেন এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ‘বিশ্বস্ত সামরিক উপদেষ্টা’ হিসেবে দেখছেন।
গত জুনে এক বৈঠকে ইরান ইস্যুতে আলোচনা শেষে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, পাকিস্তান ইরানকে অনেকের চেয়ে ভালো বোঝে। এছাড়া গাজা পরিকল্পনাতেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সাফল্যের দাবি করা হলেও, দেশের ভেতরে এই অবস্থান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। গাজা ‘বোর্ড অব পিস’-এ অংশগ্রহণ এবং ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে।
পাকিস্তানের প্রখ্যাত পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত দেশটির সাবেক এক রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেছেন, গাজা ইস্যু থেকে পাকিস্তানের দূরে থাকা উচিত। বুদ্ধিজীবীসহ বিভিন্ন মহল সরকার ও সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্বার্থ বিক্রির অভিযোগ তুলেছেন। ইরান যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানের সৌদি আরবে হামলার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, রিয়াদের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তানও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। একই সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামাবাদ।
তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, হামলার পর যথাযথ প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে পাকিস্তান সৌদি আরবকে হতাশ করেছে, যা তাদের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের বিবৃতিগুলোও অনেকের কাছে উদ্বেগ বা সংহতি প্রকাশের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এরই মধ্যে করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীদের নিহত হওয়ার ঘটনা এবং তাতে মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। ইসলামাবাদ ও লাহোরে বিক্ষোভ ঠেকাতে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ, খামেনির মৃত্যু এবং পাকিস্তানের নরম প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে জনরোষ বাড়ছে। শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে কারফিউ জারি হওয়ায় অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাম্প্রতিক ইসরায়েল সফর আঞ্চলিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করেছেন, দেশটি চারদিক থেকে হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন এক সময়ে যখন ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা ইতোমধ্যেই বিদ্যমান, তখন ইরান ইস্যুতে স্পষ্ট কৌশল গ্রহণে ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
কামাল আলম: মধ্যপ্রাচ্যের সমকালীন সামরিক ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তিনি ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটে ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে ইনস্টিটিউট ফর স্টেটক্র্যাফটে ফেলো হিসেবে কর্মরত আছেন এবং আটলান্টিক কাউন্সিলে নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক স্টাফ কলেজে নিয়মিত বক্তৃতা দিয়ে থাকেন।
বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প






































