রবিবার । মার্চ ১৫, ২০২৬
মিজানুর রহমান মতামত ১৫ মার্চ ২০২৬, ২:৫৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি: খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ


Mizanur Rahman

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি: খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ

গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য হ্রাস এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সূচকে উন্নতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চাপ সেই অগ্রগতির ধারাকে কিছুটা হলেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান দাম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস—সব মিলিয়ে নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলো চরম চাপে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে। রাজধানীর কড়াইল বস্তিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, এই কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী পরিবারগুলোকে মাসিক ২,৫০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো এই উদ্যোগের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা এবং বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা করা।

সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করা গেলে এই কর্মসূচি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ—খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। গত তিন বছর ধরে দেশে ধারাবাহিকভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম দ্রুত বেড়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য চাল, ডাল, তেল, শাকসবজি বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের দাম সামান্য বাড়লেও তা তাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে বড় প্রভাব ফেলে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে নারী ও শিশুদের ওপর। পরিবারে খাদ্যের সংকট দেখা দিলে মায়েরাই সাধারণত প্রথমে নিজের খাবার কমিয়ে দেন যাতে পরিবারের অন্য সদস্যরা খেতে পারে। অন্যদিকে শিশুদের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় তাদের পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এর ফলে শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান Power and Participation Research Centre–এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ক্রমাগত মূল্যস্ফীতি এবং আয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে একটি সহায়ক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পেলে অনেক পরিবার তাদের ন্যূনতম খাদ্য চাহিদা পূরণ করতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কেনার সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে। অনেক পরিবারের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য নগদ সহায়তা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে এই ভাতা দেওয়া হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো দেশের প্রায় দুই কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য বিপুল আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন হবে। হিসাব অনুযায়ী, এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে মাসে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।

এত বড় কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে চালু রাখতে হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বহু বছর ধরেই বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। প্রত্যক্ষ কর বাড়নো, পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রাজস্ব খাতকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর বিচ্ছিন্ন কাঠামো। বর্তমানে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০০টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সমন্বয়ের অভাবে একই ব্যক্তি একাধিক সুবিধা পায়, আবার প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো অনেক সময় বাদ পড়ে যায়। এই বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সামাজিক সুরক্ষা খাতকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।

একটি সমন্বিত উপকারভোগী ডাটাবেজ তৈরি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো সহজ হবে। একই সঙ্গে এই উদ্যোগ জাতীয় পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং মানব উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি যদি রাজনৈতিক প্রভাব বা স্থানীয় পক্ষপাতের কারণে পরিচালিত হয়, তাহলে তার কার্যকারিতা দ্রুত কমে যায়। ইতোমধ্যে কিছু স্থানে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক সময় মধ্যস্বত্বভোগী বা সুযোগসন্ধানীরা দরিদ্র মানুষকে প্রতারিত করে। তাই এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রযুক্তিনির্ভর উপকারভোগী শনাক্তকরণ, স্থানীয় পর্যায়ে যাচাই প্রক্রিয়া এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

সবশেষে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সফলতা কেবল কতটি কার্ড বিতরণ হলো বা কত টাকা দেওয়া হলো তার ওপর নির্ভর করবে না। প্রকৃত সফলতা হবে তখনই, যখন এই কর্মসূচির ফলে দরিদ্র পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা বাড়বে, শিশুদের পুষ্টিকর খাবারের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং মায়েরা গর্ভকাল ও স্তন্যদানকালীন সময়ে পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারবেন।

বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি সুরক্ষা জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হওয়া উচিত। সঠিক পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং স্বচ্ছ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি কার্যকর সুরক্ষা বলয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

মিজানুর রহমান: লিড- হেলথ, নিউট্রিশন অ্যাণ্ড ওয়াশ, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ।