সোমবার । এপ্রিল ২৭, ২০২৬
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু মতামত ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার

বাকস্বাধীনতা কী দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স?


Dulu bhai

বাকস্বাধীনতা কী দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স?

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ আর শুধু যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম নয়—এটি মত প্রকাশের এক বিশাল ক্ষেত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মত প্রকাশ কি সত্যিই ‘বাকস্বাধীনতা’, নাকি ক্রমশ তা পরিণত হচ্ছে ‘বাকদুর্ব্যবহারে’? গত কয়েক বছরে আমরা যে প্রবণতা দেখছি, তা শুধু উদ্বেগজনক নয়—এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য আমাদের বাস্তবতা থেকে চোখ ফেরানো যাবে না। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কেউ, যেকোনো সময়, যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে পারছে। রাজনৈতিক মতভেদ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব কিংবা নিছক জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভ—সবকিছুর মিলিত প্রভাবে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ‘ডিজিটাল অসভ্যতা’। এই অসভ্যতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে—এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। অনেকেই মনে করেন, বাকস্বাধীনতা মানেই সীমাহীন স্বাধীনতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বাকস্বাধীনতা কখনোই দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে মত প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু তা অবশ্যই অন্যের সম্মান, মর্যাদা এবং সামাজিক শালীনতা বজায় রেখে হতে হবে। যখন এই সীমা অতিক্রম করা হয়, তখন তা আর স্বাধীনতা থাকে না—তা হয়ে যায় অপব্যবহার।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে আমরা দেখেছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, এমনকি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়েও অশালীন ভাষায় পোস্ট করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ব্যক্তিত্বদের লক্ষ্য করে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়, তা শুধু লজ্জাজনক নয়—অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এসব ঘটনায় অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

এই প্রবণতার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো—এটি তরুণ প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে। নতুন প্রজন্ম সামাজিক মাধ্যমকে তাদের মত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। যখন তারা দেখে, অশালীন ভাষা ব্যবহার করেই কেউ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বা ভাইরাল হচ্ছে, তখন তারা সেটাকেই অনুসরণ করতে শুরু করে। ফলে একটি বিকৃত সংস্কৃতি তৈরি হয়, যেখানে শালীনতা দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং অসভ্যতা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

এখন প্রশ্ন আসে—এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী?
প্রথমত, সামাজিকভাবে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে—কীভাবে ভদ্রভাবে মত প্রকাশ করতে হয়, কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়। শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা নয়, “ডিজিটাল নৈতিকতা” শেখানো এখন সময়ের দাবি।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ প্রায়ই দুর্বল। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অশালীন ভাষা ব্যবহার করে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। কয়েকটি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এই প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখানে একটি ভারসাম্য দরকার—আইনের অপব্যবহার যেন না হয়, আবার অপরাধীরাও যেন ছাড় না পায়।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলোকে আরও কার্যকর কনটেন্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বাংলা ভাষার জন্য বিশেষভাবে অ্যালগরিদম উন্নয়ন করা দরকার, যাতে অশালীন ও ঘৃণামূলক বক্তব্য দ্রুত শনাক্ত করা যায়।

চতুর্থত, গণমাধ্যমের দায়িত্বও কম নয়। মূলধারার মিডিয়া যদি সচেতনভাবে শালীন ভাষা ও গঠনমূলক আলোচনা প্রচার করে, তবে সেটি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ক্যাম্পেইন চালানো যেতে পারে—যেখানে শালীন ভাষা ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।

এখানে একটি বাস্তব উদাহরণ উল্লেখ করা যায়। সম্প্রতি কিছু ঘটনায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে একটি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে অশালীন মন্তব্যের বন্যা বইছে। পরে যখন সত্য প্রকাশিত হয়েছে, তখন সেই একই ব্যক্তিরা নীরব হয়ে গেছে। এই ধরনের আচরণ শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—এটি সামগ্রিকভাবে সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করে।

আরেকটি দিক হলো—রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনেও অনেক সময় ভাষার শালীনতা বজায় থাকে না। নেতৃবৃন্দ যদি নিজেরাই পরস্পরের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন, তাহলে সাধারণ মানুষও সেটাকেই গ্রহণযোগ্য মনে করবে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকেও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত।

সবশেষে, বিষয়টি শুধু আইন বা প্রশাসনের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জ। আমাদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। মনে রাখতে হবে—শালীনতা দুর্বলতা নয়, এটি সভ্যতার পরিচয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের অধিকার, কিন্তু সেই স্বাধীনতা তখনই মূল্যবান, যখন তা অন্যের সম্মানকে অক্ষুণ্ণ রাখে।
এখনই সময়—সামাজিক ও প্রশাসনিক উভয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। না হলে “বাকস্বাধীনতা”র আড়ালে “বাকদুর্ব্যবহার” আমাদের সমাজকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।

ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]

বাংলা টেলিগ্রাফ ভিজ্যুয়াল