
৪৬ বছর বয়সী মা নিং দীর্ঘদিন ধরে চীনা ফুটবলে পরিচিত মুখ
বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া দলগুলোর খেলোয়াড়দের বিদায় অনুষ্ঠান সাধারণত বেশ জাঁকজমকপূর্ণ হয়। কিন্তু এবার সেই সুযোগ পায়নি চীন। কারণ দেশটির জাতীয় ফুটবল দল আবারও বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তবে তাতে বিশ্বকাপ নিয়ে চীনা সমর্থকদের আগ্রহ কমেনি। বরং তারা এখন সমর্থন দিচ্ছেন এক ভিন্ন ধরনের জাতীয় প্রতিনিধিকে—রেফারি মা নিংকে। কঠোর ও আপসহীন সিদ্ধান্তের জন্য পরিচিত এই রেফারির ডাকনামই হয়ে গেছে ‘কার্ড মাস্টার’।
৪৬ বছর বয়সী মা নিং দীর্ঘদিন ধরে চীনা ফুটবলে পরিচিত মুখ। তবে সবসময় তিনি সমর্থকদের প্রিয় ছিলেন না। অনেক সময় তার বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।
২০১৫ সালে সাংহাই ডার্বির এক উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে তিনি ৯টি হলুদ কার্ড এবং ৩টি লাল কার্ড দেখিয়ে ব্যাপক আলোচনায় আসেন। এরপর থেকেই ‘কার্ড মাস্টার’ নামটি তার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া একমাত্র চীনা রেফারি হিসেবে মা নিংকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। তাকে নিয়ে বিভিন্ন হ্যাশট্যাগ কোটি কোটি বার দেখা হয়েছে।
চীনের জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রেডনোটে একজন ব্যবহারকারী মজা করে লিখেছেন, ‘অন্য দেশের মানুষ তাদের জাতীয় দলের খেলা দেখে, আর আমরা দেখি আমাদের রেফারি কতগুলো কার্ড দেখান।’
মা নিংয়ের জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে তিনি বিশ্বকাপ উপলক্ষে চীনের শীর্ষ কয়েকটি ব্র্যান্ডের স্পন্সরশিপও পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লেনেভো এবং ইলেকট্রনিক্স নির্মাতা হাইসেন্স।
গত মাসে রেডনোটে নিজের অ্যাকাউন্ট খোলার পর থেকেই দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। বর্তমানে সেখানে তার অনুসারীর সংখ্যা দুই লাখ ১০ হাজারের বেশি। বিশ্বকাপে যোগ দিতে বিমানবন্দরে যাওয়ার একটি ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছিলেন, ‘চলুন শুরু করা যাক!’
এর জবাবে একজন ব্যবহারকারী রসিকতা করে মন্তব্য করেন, ‘তার লাগেজ নিশ্চয়ই হলুদ আর লাল কার্ডে ভর্তি।’
আরেকজন লেখেন, ‘বোর্ডিং পাসের দরকার নেই, একটা লাল কার্ড দেখালেই হবে!’
চীনের অনেক সমর্থকই জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের জন্য নয়, এবার তারা মা নিংয়ের পরিচালিত ম্যাচ দেখতেই আগ্রহী। যদিও ম্যাচগুলোর সময় চীনের সঙ্গে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার পার্থক্য রয়েছে।
চীনের শীর্ষ লিগে নিয়মিত ম্যাচ পরিচালনার পাশাপাশি তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দায়িত্ব পালন করেন মা নিং। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও তাকে দেখা যায়।
২০১১ সাল থেকে ফিফা স্বীকৃত রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মা নিং। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে তিনি কয়েকটি ম্যাচে চতুর্থ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন। এবার তিনি মূল রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্বকাপে রওনা হওয়ার আগে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সেরা রেফারিদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ কাজে লাগাতে চাই। সেই অভিজ্ঞতা চীনের ফুটবলে ফিরিয়ে আনব।’
চীন সর্বশেষ ২০০২ সালে বিশ্বকাপে খেলেছিল। সেটিই এখন পর্যন্ত দেশটির একমাত্র বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ। সেই আসরে কোনো গোল করতে না পেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।
এরপর থেকে চীনকে বৈশ্বিক ফুটবল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে আসছে দেশটি। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একসময় বলেছিলেন, তার তিনটি স্বপ্ন হলো—চীনের বিশ্বকাপে খেলা, বিশ্বকাপ আয়োজন করা এবং একদিন বিশ্বকাপ জেতা।
তবে আর্থিক সংকট, দুর্নীতির অভিযোগ, মহামারির প্রভাব এবং অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সেই স্বপ্ন অনেকটাই পিছিয়ে গেছে। ফলে এবার বিশ্বকাপে চীনের সমর্থকদের ভরসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন একজন কঠোর, কার্ড দেখাতে দ্বিধাহীন রেফারি—মা নিং।















































