বুধবার । মার্চ ৪, ২০২৬
শাহরিয়ার বিপ্লব মতামত ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

এআই, অপতথ্য ও বাংলাদেশের গণতন্ত্র: ভোটের মাঠে শুরু হয়েছে অদৃশ্য যুদ্ধ


AI Inner

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষত ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পর এটিই প্রথম ভোট। এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং প্রচারণা শুরু হওয়ার মাঝেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া খবর, মিথ্যা AI-কন্টেন্ট ও প্রবল ‘ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা’ ছড়িয়ে পড়েছে, যা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী দলের ভাবমূর্তিই নষ্ট করছে না বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার ভাবমূর্তি ও জাতীয় আস্থা দুটোই ক্ষুন্ন করছে।

বিশ্বব্যাপী দেখা যাচ্ছে যে তথ্যজনিত ভুল তথ্য (misinformation) এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা (disinformation) এখন প্রযুক্তিগতভাবে খুব সহজে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। বিশেষ করে AI-সৃষ্ট ভিডিও, অডিও, ছবি ও “deepfake” কন্টেন্টের মাধ্যমে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ডিজিটাল সমাজে এই সমস্যা সহজে এবং গভীরভাবে প্রবেশ করেছে। যার প্রভাব আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপকভাবে পড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি এখন কেবলই প্রযুক্তিগত প্রশ্ন নয়; বরং রাজনৈতিক, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে বড় একটি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিজিটাল ডোমেইনে misinformation: পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা
বর্তমান বাংলাদেশে ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের বাইরে সামাজিক মিডিয়ায় misinformation ও AI-জেনারেটেড কন্টেন্ট গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপর ভয়াবহ প্রভাব তৈরি করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন fact-checking সংগঠন এবং মিডিয়া বিশ্লেষণে পাওয়া নতুন ডেটা থেকে বোঝা যায়, misinformation-এর মাত্রা এবং প্রভাবের ক্ষেত্রটি আগের বছরের তুলনায় অনেক গুণ বেড়েছে।

দ্রুত বেড়েছে misinformation-এর সংখ্যা
Rumor Scanner-এর পরিসংখ্যান অনুসারে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ সময়ে প্রায় ২,৭৫৪টি misleading তথ্য চিহ্নিত হয়েছে, যা গত বছর একই সময়ে থেকে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে রাজনৈতিক বিষয়ই প্রায় ৬৪ শতাংশ।

কেবল তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ৯৫৯টি আলাদা অথচ ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়, যা ভোটীয় ইস্যুগুলোর ওপর তথ্যবিভ্রাট ছড়ানোর একটি বড় ঢেউ নির্দেশ করে। ([turn0news8])

AI-জেনারেটেড ভিডিও ও deepfake দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ ভুল তথ্য ছড়ানোর থেকে আজ AI-জেনারেটেড ভিডিও ও সিন্থেটিক কন্টেন্ট ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল মিডিয়া বিশ্লেষণে ৭০টি AI-জেনারেটেড সামাজিক ভিডিও শনাক্ত করা হয়েছে, যা একত্রে ২,৩০০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ পেয়েছে এবং তা নির্বাচনী সমর্থন বা বিরোধিতা করার উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে।

এ ছাড়া Facebook-এ নির্দিষ্ট সময়ে ৯৭টি AI-জেনারেটেড ভিডিও (ডিসেম্বর ১৪, ২০২৫ থেকে জানুয়ারী ১৪, ২০২৬) শনাক্ত হয়েছে, যা একদিনের মধ্যে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন এঙ্গেজমেন্ট পেয়েছে। অর্থাৎ অগণিত ব্যবহারকারী এই কন্টেন্টগুলোতে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এবং ভুল তথ্য পেয়েছে

গঠনমূলক ও বিভ্রান্তিকর কন্টেন্টের প্রকৃতি
এই AI-কন্টেন্টগুলো সাধারণ ভুল দাবির বাইরে ’ভুয়া ভোটার’, ‘ভুয়া বক্তা’, ‘ভুয়া সমর্থন’ ইমেজ, ভিডিও বা synthetic voice ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব রাজনৈতিক নির্দেশক বা প্রভাবশালী নেতা-নেত্রীর নামে deepfake ভিডিও বা কন্টেন্ট ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তারা এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে দেখানো হয়, যা কখনোই করা হয়নি।

সামাজিক মিডিয়ার ব্যবহার বিস্তৃতি এবং vulnerable voter base
বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে এবং এর মধ্যে ৬৪ মিলিয়নের বেশি ফেসবুক, ৫০ মিলিয়ন ইউটিউব, ও ৫৬ মিলিয়নের বেশি টিকটক ব্যবহারকারী রয়েছে। এই বিশাল ডিজিটাল রিচের কারণে misinformation খুব দ্রুত ছড়াতে পারে।

তথ্যটি কেন ভীতি সৃষ্টি করছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একবার misinformation বা deepfake মানুষের সামনে বারবার উপস্থাপিত হলে— এমনকি যদি তা ভুলও হয়—মানুষ সেটিকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় illusion of truth effect।

এই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সাজানো অভিযোগ, ভুয়া স্ক্যান্ডাল বা নেতাদের নামে বানানো বক্তব্য ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলাফল দাঁড়ায়—মানুষ ভোট দেয় তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং আবেগ ও বিভ্রান্তির ভিত্তিতে।

কারা ছড়াচ্ছে অপতথ্য?
AI-generated ও ডিজিটাল misinformation-এর মধ্যে লক্ষ্যণীয় দিক হলো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব লক্ষ্য বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতি ফোকাস। একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াতপন্থী AI-সমর্থিত কন্টেন্ট মূলত বিএনপি-এর নামে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে। ঠিক একই ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে বিরোধী শিবিরে। বিএনপিপন্থী AI-কন্টেন্ট জামায়াতকে ধর্মীয় নৈতিকতার বাইরে দেখানোর চেষ্টা করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে দুটি প্রধান রাজনৈতিক পন্থার অনুসারীরাই misinformation ছড়াচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ও ভোটের মাঠে সংশয় সৃষ্টি করা।

একইভাবে, পতিত আওয়ামী লীগের সাথে সরাসরি জড়িত বা ভাবদর্শের সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলো অতীত অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বা এনসিপি’র মতো নতুন রাজনৈতিক দলগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে মিথ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।

আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, misinformation-এর সহজ টার্গেট হচ্ছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নারী নেত্রীরা। নারীদের নিয়ে করা অপতথ্য আর কন্টেন্টগুলো ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত। আফসোসের বিষয় হলো, এসব কন্টেন্ট সরিয়ে ফেলতে দৃশ্যমান এবং কার্যকর কোনো পদক্ষেপই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

জাল ফটোকার্ড: সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন অস্ত্র
সাম্প্রতিক সময়ের একটি বিশেষ বিপজ্জনক কৌশল হলো ফটোকার্ড বা ভুয়া নিউজ গ্রাফিক্স তৈরি করা। যা মূলধারার সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলের লেআউট ও ডিজাইনের মতো দেখায়, কিন্তু তাতে মিথ্যা বিবৃতি বা নেতাদের কথাবার্তা জুড়ে দেওয়া হয়। এ ধরনের কন্টেন্টকেও ব্যবহার করা হচ্ছে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে, এবং ভোটারদের বিভ্রান্ত করে ভুল মতামত তৈরিতে।

জনমত, আস্থা ও ভোটে অংশগ্রহণে ক্ষতি
গত বছর প্রথম আলো তার একটি মতামত বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে ভুয়া সংবাদের প্রভাবে অনেক ভোটারই প্রতারিত হচ্ছেন বলে মনে করছেন। তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে অনাস্থা ও ধোঁকার অনুভূতি। এমনকি অনেক মানুষ ভোটে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে নিজ নিজ মনোভাব নিয়েও সংশয়ে ভুগতে শুরু করেন।

বিশ্বজুড়ে নির্বাচনে misinformation-এর প্রভাবের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভোটারদের মধ্যে ভুল ধারণা জন্মানো, ভোটে অংশগ্রহণ কমানো বা রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতি অবিশ্বাস তৈরি করা লক্ষণীয়। বাংলাদেশেও প্রায় একই রকম প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মিথ্যা তথ্যের ঊর্ধ্বগতি প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশে একটি সুসংগঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তরণকে বাধাগ্রস্ত করছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি নির্বাচন শুধুমাত্র ব্যালটবক্সে ভোট দেয়ার ব্যাপার নয়; এটি বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, বাস্তব আলোচনা ও মতাদর্শভিত্তিক প্রকৃত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করে।

যখন misinformation ভোটারকে বিভ্রান্ত করে বা ভুল সিদ্ধান্তে পরিচালিত করে, তখন সেই নির্বাচন “সত্যিকারের গণতন্ত্র” হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না।

আমরা যে বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছি তা একদম নতুন নয়; বিশ্বের অনেক দেশেই নির্বাচন এ ধরনের misinformation-এর সাথে লড়াই করছে। কিন্তু বাংলাদেশে ডিজিটাল সাক্ষরতার কমতি ও তথ্য যাচাই করার ক্ষমতার অভাব এই সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিশেষত গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে এটি সবচেয়ে ক্ষতিকর: তারা তুলনামূলকভাবে ভেরিফিকেশন এবং ফ্যাক্ট-চেকিং টুলের সাথে পরিচিত নয়, ফলে misinformation-এর ক্ষতি অনেকটা মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচন এখন শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার লড়াই নয়; এটি ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব যাচাই করার প্রতিযোগিতাও বটে। সঠিক তথ্যবহুল নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইনি ধারা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন:
• সামাজিক মিডিয়া ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কঠোর মডারেশন এবং তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা;
• উচ্চ স্তরের ডিজিটাল সাক্ষরতা ও তথ্য যাচাইয়ে সামাজিক শিক্ষা;
• আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা;
• আস্থা-ভিত্তিক সহানুভূতিশীল রাজনৈতিক প্ৰচার;
• গণমাধ্যম ও fact-checker সংগঠনগুলোকে সমর্থন।

এইসব পদক্ষেপ যদি কার্যকরভাবে না নেয়া যায়, তাহলে misinformation শুধু নির্বাচনের ফলাফলের উপরে প্রভাব ফেলবে না — বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে আরো বিপন্ন করবে।

শাহরিয়ার বিপ্লব: জার্মানপ্রবাসী সাংবাদিক।

বাংলা টেলিগ্রাফ উদ্যোগের গল্প