শনিবার । মার্চ ২৮, ২০২৬
ড. ওমর আশুর মতামত ২৭ মার্চ ২০২৬, ৮:৪০ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরানের যুদ্ধ কৌশলের শক্তি ও দুর্বলতা


iran

নিজস্ব আকাশসীমায় শক্তিশালী শত্রু বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইরানের দুর্বলতা রয়েছে

“আমরা যুদ্ধ শুরু করব না, তবে যেকোনো আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার জন্য আমাদের কাছে বিপুল শক্তি রয়েছে।” প্রায় এক বছর আগে এমন মন্তব্য করেছিলেন ইরানের সামরিক কমান্ডার হোসেইন সালামি। কয়েক মাস পরই তিনি ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন।

ইরানের যুদ্ধ কৌশল মূলত প্রচলিত সীমান্ত প্রতিরক্ষার চেয়ে ভিন্ন এক বহুস্তরীয় “ফরওয়ার্ড ডিফেন্স” ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেছে যেন মূল সংঘর্ষ দেশের ভেতরে না পৌঁছে—এর জন্য তারা বিদেশে মিত্র অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও একমুখী আক্রমণকারী ড্রোন, দেশে দ্বৈত সামরিক কাঠামো এবং সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রতিরোধের “ছায়া” ব্যবহার করে এসেছে।

তবে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল অভিযানে এই কৌশলের শক্তি যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়েছে। অনেকের ধারণার তুলনায় ইরানকে অচল করা কঠিন হলেও নিজেদের আকাশসীমা রক্ষা করতে তারা প্রত্যাশিত সক্ষমতা দেখাতে পারেনি।

যুদ্ধ কৌশলের ঐতিহাসিক শিকড়
ইরানের বর্তমান সামরিক কৌশলের ভিত্তি তৈরি হয় ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়। সেই দীর্ঘ সংঘাতে তীব্র চাপের মুখে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হালকা পদাতিক বাহিনী, গোপন অনুপ্রবেশ, ছড়িয়ে থাকা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আত্মত্যাগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় সমুদ্রপথে ‘সোয়ার্মিং’ বা ঝাঁকবদ্ধ আক্রমণ কৌশল।

বর্তমানে ইরানের সামরিক কাঠামোও সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। নিয়মিত সেনাবাহিনী ‘আরতেশ’ স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রচলিত দায়িত্ব পালন করে। এর পাশাপাশি রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), যা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, বিদেশি অভিযানে সমন্বয় এবং শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া বাসিজ নামের আধাসামরিক সংগঠন রয়েছে, যা মূলত গণসমাবেশ, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও যুদ্ধকালীন সহায়তা বাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

চোকপয়েন্ট বা সংকীর্ণ পথের যুদ্ধ
১৯৮৮ সালের পর ইরান খুব কম ক্ষেত্রেই সরাসরি বিদেশে যুদ্ধ করেছে, শুধু ২০১০-এর দশকে সিরিয়া ও ইরাকে উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব সংঘাত থেকে তারা নগর যুদ্ধ ও মিলিশিয়া সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা পেলেও আধুনিক উন্নত বিমান হামলার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ততটা তৈরি হয়নি।

ইরানের বড় কৌশলগত উদ্ভাবন ছিল অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের সঙ্গে জোট গঠন। হিজবুল্লাহ, ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথিরা—এসব সংগঠন নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রেখেও ইরানের কৌশলগত নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে উঠেছে। এর ফলে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা তেহরানের জন্য সহজ হয়েছে।

একই সঙ্গে আইআরজিসির এয়ারোস্পেস শাখা মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং শক্তিশালী ড্রোন বাহিনী গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ‘শাহেদ’ সিরিজের ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে একযোগে আক্রমণের কৌশলে ব্যবহৃত হয়।

সমুদ্রপথে কৌশল
ইরানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো সামুদ্রিক কৌশল। নিয়মিত নৌবাহিনী সমুদ্রপথে উপস্থিতি বজায় রাখলেও আইআরজিসির নৌ শাখা পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিকে মাইন, অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র, দ্রুতগতির নৌকা ও ড্রোনের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার কৌশল নিয়েছে।

এই কৌশলকে বলা হয় ‘চোকপয়েন্ট ওয়ারফেয়ার’। শক্তিশালী নৌবহর না থাকায় ইরান সরাসরি সমুদ্র নিয়ন্ত্রণের বদলে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।

শক্তি ও দুর্বলতা
এই বহুস্তরীয় কৌশল ইরানকে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়েছে। তবে বর্তমান যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে—নিজস্ব আকাশসীমায় শক্তিশালী শত্রু বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইরানের দুর্বলতা রয়েছে।

তবুও দেশটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। শীর্ষ সামরিক নেতারা নিহত হওয়ার পরও ইরান দ্রুত পাল্টা হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে। বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড ব্যবস্থা, বাসিজ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ভূমিকা এবং ছড়িয়ে থাকা সামরিক কাঠামো এই স্থিতিশীলতার কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা কৌশলগত সাফল্য পেলেও শুধুমাত্র আকাশপথের আক্রমণ যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাধান নয়।

যদি সংঘাতের পরবর্তী রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট না করা হয়—তাহলে ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে সামরিক সাফল্য শেষ পর্যন্ত কৌশলগত পরাজয়ে পরিণত হয়।

ড. ওমর আশুর কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের ক্রিটিক্যাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার এবং আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইউনিটের পরিচালক।