
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এই প্রথম তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
রবিবার (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে এক পর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলার অতিক্রম করে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই এই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এই প্রথম তেলের দাম আবার ১০০ ডলারের ওপরে উঠল।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই মূল্যবৃদ্ধিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ট্রুথ সোশ্যাল-এ এক পোস্টে তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদে তেলের দাম বাড়লেও ইরানের পারমাণবিক হুমকি ধ্বংস হলে দ্রুত তা কমে যাবে এবং বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য এটি ‘খুব ছোট মূল্য’।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটও বলেছেন, পেট্রোল পাম্পে দামের যে কোনো বৃদ্ধি ‘অস্থায়ী’ হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এছাড়া তেল পরিবহনে বাধার কারণে ওপেকভুক্ত বড় উৎপাদক দেশ ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনাও সরবরাহ সংকট আরও বাড়িয়েছে।
কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতের কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়েছে।
শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ইরানের তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরান ও আলবোর্জ প্রদেশে চারটি তেল সংরক্ষণাগার এবং একটি তেল স্থানান্তর কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
রবিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, প্রতিশোধ হিসেবে তারা পুরো অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিশ্ব শেয়ারবাজারেও। সোমবার (৯ মার্চ) সকালে এশিয়ার বাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক লেনদেনের শুরুতেই ৭ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক ৮ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার আগেই ফিউচার লেনদেনেও বড় পতন দেখা গেছে। ওয়াল স্ট্রিটের বেঞ্চমার্ক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ১.৭ শতাংশ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক কম্পোজিট ফিউচার প্রায় ১.৯ শতাংশ কমেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে বলে দাবি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ব অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়া এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ভয় তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০ শতাংশ বাড়লে বিশ্বে মুদ্রাস্ফীতি প্রায় ০.৪ শতাংশ বাড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.১৫ শতাংশ কমে যায়।
জোন্স ট্রেডিংয়ের প্রধান বাজার কৌশলবিদ মাইক ও’রুর্কে বলেন, যদি এই ধাক্কা স্বল্পমেয়াদি হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের দাম এভাবে থাকলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
এদিকে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব তেল উৎপাদক দেশ উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে এবং তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।







































