সোমবার । মার্চ ৯, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৯ মার্চ ২০২৬, ১১:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার

যুদ্ধের মধ্যেই নতুন নেতাকে ঘিরে ইরানে ঐক্য


Iran

নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে সামরিক কমান্ডার, রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মুখে থাকা ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে ঘিরে সামরিক কমান্ডার, রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দিচ্ছেন এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

৮৮ সদস্যের ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ—যারা মূলত ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত—তারা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনিকে তার উত্তরসূরি হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনেই নিহত হন আলী খামেনি।

মোজতবা খামেনি খুব কম জনসমক্ষে এসেছেন বা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে তাকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার পেছনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়, বিশেষ করে ইরানের প্রভাবশালী ইসলামিক রেভ্যুলশানির গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

তার নেতৃত্বে আসা ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত ধর্মতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সেনাবাহিনীর সমর্থন
দেশের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি আইআরজিসি নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশকারী প্রথম প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।

আইআরজিসি জানায়, তারা খামেনির “ঐশী নির্দেশনা” পূর্ণভাবে মেনে চলতে এবং ইসলামি বিপ্লবের মূল্যবোধ ও প্রথম দুই সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি ও আলী খামেনির উত্তরাধিকার রক্ষায় আত্মত্যাগ করতে প্রস্তুত।

আইআরজিসির মহাকাশ, স্থল ও নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন শাখা আলাদা বিবৃতিতে সমর্থন জানায়।

এ ছাড়া ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী, পুলিশের উচ্চপদস্থ কমান্ড এবং প্রতিরক্ষা পরিষদও নতুন নেতার নির্দেশ মানার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। দেশটির গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খাতিব বলেন, এই নির্বাচন প্রমাণ করে ‌‘ইসলামি ইরানের সামনে কোনো অচলাবস্থা নেই এবং বিজয়ের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সব সময়ই রয়েছে।’

১২ সদস্যের সাংবিধানিক তদারকি সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিল মোজতবা খামেনির নির্বাচনকে তার পিতার মৃত্যুতে “দুঃখের ওপর প্রলেপ” বলে উল্লেখ করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রভাবশালী ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র, সরকার, বিচার বিভাগ এবং সংসদের প্রধানরাও একই ধরনের সমর্থন জানিয়েছেন।

কিছুটা সতর্ক প্রতিক্রিয়া
তবে আলী লারজানি, যিনি সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব, তুলনামূলকভাবে কম উৎসাহী প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটি আইন অনুযায়ী হয়েছে, তাই তিনি তা সমর্থন করছেন।

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি অনেক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞ পরিষদের স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়া সেই সব প্রচারণার স্পষ্ট জবাব দিয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, সর্বোচ্চ নেতার পদটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং সবাইকে তাকে সহায়তা করতে হবে। তার আশা, মোজতবা খামেনির সময়ে ইরান উন্নয়নের পথে এগোবে, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং জনগণের জন্য আরও স্থিতি ও কল্যাণ নিশ্চিত হবে।

ধর্মীয় মর্যাদা বৃদ্ধি
নতুন নেতাকে প্রশংসা করা প্রায় সবাই তাকে ‘আয়াতুল্লাহ’ বলে উল্লেখ করছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, তার ধর্মীয় মর্যাদা আগের হুজ্জাতুল ইসলাম স্তর থেকে উন্নীত করা হয়েছে।

রাষ্ট্র-সমর্থিত কট্টরপন্থী গণমাধ্যমের কিছু অংশ তাকে ‘ইমাম’ বলেও উল্লেখ করেছে—যে উপাধি সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং যা আলী খামেনি ও খোমেনিকেও বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে তেহরান, মাশহাদ ও ইসফাহানসহ বিভিন্ন শহরের গুরুত্বপূর্ণ মসজিদে তার নির্বাচনের ঘোষণা প্রচার করা হয়।

সরকারি বার্তায় নাগরিকদের তেহরানের এঙ্গেলাব (বিপ্লব) স্কয়ারসহ বিভিন্ন স্থানে সমবেত হয়ে নতুন নেতার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়।

চলমান হামলা ও অনিশ্চয়তা
এদিকে সোমবার বিকেলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান তেহরান ও ইসফাহানে বোমা হামলা চালায়। এর দুই দিন আগে রাজধানীর তেল মজুত কেন্দ্র ও শোধনাগারে বড় ধরনের হামলার ফলে শহরের আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া দেখা যায়।

নতুন নেতা মোজতবা খামেনির সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা থেকে আত্মরক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর হুমকি দিয়েছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড নতুন নেতার নির্বাচনে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকা উচিত।

মোজতবা খামেনির ক্ষমতায় আসা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোয় কঠোরপন্থীরা এখনও শক্ত অবস্থানে রয়েছে এবং স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন আলোচনায় যাওয়ার আগ্রহ কম থাকতে পারে।

আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর কমান্ডাররা তার নির্বাচনের পরও হামলা অব্যাহত রেখেছেন। এক আইআরজিসি কমান্ডার রাষ্ট্রীয় টিভিকে জানান, ইরান অন্তত ছয় মাস পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য হামলা চালিয়ে যেতে সক্ষম।

অর্থনৈতিক চাপ
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানি সীমিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, যা দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ সেখানে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হতে পারে।

ইরানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে এবং খাদ্যপণ্যের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ১০০ শতাংশেরও বেশি।

বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রাগুলোর একটি এখন ইরানের জাতীয় মুদ্রা। তবে সরকার বলছে, প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশে খাদ্য ও জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি হবে না এবং সে জন্য জরুরি পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে।