
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর মাত্র দুই দিন আগে কেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরায়েল সফর করেছিলেন—গত কয়েক দিনে ভারতজুড়ে এই প্রশ্নটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গত এক সপ্তাহ ধরে চলা ইরান যুদ্ধ ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে ইরানে ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে মোদির ইসরায়েল সফর, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘শান্তি, উদ্ভাবন ও সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা—এসব বিষয় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এমনকি ইসরায়েলি পার্লামেন্ট কনেসেটের একটি বিশেষ পদকও গ্রহণ করেছেন মোদি।
সমালোচকদের প্রশ্ন—ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন হামলার বিষয়ে কি আগে থেকেই অবগত ছিলেন মোদি?
এরই মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ভারত সরকার নিন্দা জানায় পাঁচ দিন তাও সমালোচনার মুখে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন ভারতের আমন্ত্রণে আন্তর্জাতিক নৌবহর পর্যালোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া একটি ইরানি নৌযান ফেরার পথে আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন হামলার শিকার হয়। এতে জাহাজটিতে থাকা বহু নাবিক নিহত হন। ঘটনাটি ভারতের জন্য ‘কৌশলগত অস্বস্তি’ এবং আঞ্চলিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য আঘাত হিসেবে মন্তব্য করেছেন সাবেক ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা।
হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণা
২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারত ধীরে ধীরে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ধারণার দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে অনেক গবেষক ও বিশ্লেষকের মত।
তাদের মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান—বিচারব্যবস্থা, পুলিশ এবং গণমাধ্যমের বড় অংশ—হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছে। আরএসএসই হচ্ছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শিক ভিত্তি।
সম্প্রতি হোলি উৎসবের সময় উত্তর প্রদেশের কয়েকটি শহরে মুসলমানদের মসজিদ পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে বলা হয়, যাতে উগ্র হিন্দু জনতার হামলা থেকে সেগুলো রক্ষা করা যায়। সমালোচকদের মতে, এর মাধ্যমে একটি বার্তাই স্পষ্ট হয়েছে—ভারতে টিকে থাকতে মুসলমানদের ক্রমেই নিজেদের প্রকাশ্য জীবন থেকে আড়াল করতে হচ্ছে।
গবেষক সুচিত্রা বিজয়ন বলেন, ‘‘নতুন দিল্লি এখন তার স্বার্থকে একটি সভ্যতাভিত্তিক ও ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়।”
তার মতে, ইসলামবিদ্বেষ ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলছে এবং ঐতিহ্যগত ‘জোট নিরপেক্ষতা’ নীতির জায়গায় এখন মুসলিম শক্তিকে মোকাবিলার প্রবণতা বাড়ছে।
গাজা যুদ্ধের প্রভাব
ইরান প্রশ্নে ভারতের অবস্থান বুঝতে হলে গাজা যুদ্ধের সময় তার ভূমিকা বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
গত আড়াই বছরে গাজায় দুই লাখের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত বা আহত হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সময়ে ভারত ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে, যার মধ্যে যুদ্ধ ড্রোনও রয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের জায়গায় ভারতীয় শ্রমিক পাঠানোর ঘটনাও ঘটেছে।
জাতিসংঘেও বহু ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে কূটনৈতিকভাবে সহায়তা দিয়েছে ভারত। এমনকি দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায়ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যোগ দেয়নি দিল্লি।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এক বক্তব্যে বলেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘ সহযোগিতার ইতিহাস রয়েছে। কঠিন সময়ে ইসরায়েল আমাদের পাশে থেকেছে।’
অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ
তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ ভারতের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করেছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করায় তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারত তার জ্বালানির বড় অংশই এই অঞ্চল থেকে আমদানি করে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব ও কুয়েতে প্রায় ৯০ লাখ ভারতীয় কর্মরত আছেন, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্স ভারতের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
তবু বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি হয়তো ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সুযোগের দিকেও নজর রাখছে। যদি ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে এবং দেশটি আবার বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একীভূত হয়, তাহলে ভারতীয় বড় করপোরেশনগুলো সেখানে বিনিয়োগের সুযোগ পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোটের দিকে ঝোঁক
অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, মোদির কৌশল এখন মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ঘনিষ্ঠ জোটের দিকে ঝুঁকে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদিও অতীতে ভারত নিজেকে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এর পক্ষে বলেই তুলে ধরত।
ইসরায়েল, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত আইটুইউটু জোট এবং ভারত–মধ্যপ্রাচ্য–ইউরোপ করিডোর প্রকল্পও এই ঘনিষ্ঠতার প্রতিফলন।
সমালোচকরা বলছেন, ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানো এবং ইরান প্রশ্নে নীরবতা ভারতের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধিতা না থাকায় এই নীতিতে দ্রুত কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে



































