রবিবার । মার্চ ৮, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৭ মার্চ ২০২৬, ১১:০৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

এক্সপ্লেইনার

ইরানের নিখুঁত আঘাতের পেছনে কি রাশিয়া!


Russia

রাশিয়ার সহায়তার কারণে ইরান এখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমান আরও ভালোভাবে ট্র্যাক করতে পারছে

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে রাশিয়ার সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে—মস্কোর গোয়েন্দা সহায়তা ইরানকে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সাহায্য করছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের একটি প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সহায়তার কারণে ইরান এখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমান আরও ভালোভাবে ট্র্যাক করতে পারছে।

এই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইরান-রাশিয়া সামরিক সহযোগিতা
প্রায় এক বছর আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পাজেশকিয়ান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন একটি ২০ বছরের বিস্তৃত কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও পশ্চিমা চাপের মুখে দুই দেশের সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করাই ছিল ওই চুক্তির মূল লক্ষ্য।

সম্প্রতি প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, ইরান সম্ভবত অঞ্চলের তিনটি দেশে মোতায়েন উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন রাডার ধ্বংস করেছে। যদি বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।

এই দেশগুলো আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণভাবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল।

থাড- একটি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা স্বল্প, মাঝারি ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য তৈরি। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কোম্পানি লকহেড মার্টিনের তৈরি।

লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে উন্নতি
দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা একজন গবেষকের মতে, ইরানের লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন এবং আঘাতের ধরনে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রাশিয়ার সঙ্গে তাদের আগে থেকেই সম্পর্ক রয়েছে।

তার মতে, রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়িত না হয়েও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে ইরানকে সহায়তা করতে পারে।

তবে তিনি এটাও বলেন যে মহাকাশভিত্তিক নজরদারির ক্ষেত্রে রাশিয়ার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম এবং সেখানে বেশ কিছু ঘাটতি রয়েছে।

মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত নয়টি মার্কিন ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে। হামলার গতি কমার কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।

গত সোমবার ইরানের একটি ড্রোন সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত সিআইএ’র একটি গোপন স্টেশনে আঘাত হানে বলে জানা গেছে। ‌‘তারা যে কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে, তা এক অর্থে বেশ চমকপ্রদ।’

তার মতে, ইরানের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার পরও তারা এমন হামলা পরিকল্পনা করতে পেরেছে, যা আগের সংঘাতগুলোতে অনেক উন্নত বা জটিল বলে বিবেচিত হতো।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই উন্নতি যুদ্ধের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেবে—এমনটি বলা যাবে না।

মার্কিন হতাহতের আশঙ্কা
এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে যে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন, যাদের সবাই কুয়েতে কর্মরত ছিলেন। দেশটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও উপসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে কী ঘটছে সে বিষয়ে তথ্যের ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রেরই। ফলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির সব তথ্য প্রকাশ না-ও হতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘দুঃখজনকভাবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে আরও হতাহতের সম্ভাবনা রয়েছে।’ মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ডান কেইনও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন।

হোটেলে আশ্রয় ও মানবঢাল বিতর্ক
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানামাতে অবস্থিত ক্রাউন প্লাজা হোটেলে ১ মার্চ ইরানের হামলার সময় সেখানে দুইজন মার্কিন কর্মী অবস্থান করছিলেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আঘারচি অভিযোগ করেন, ‘আমেরিকানরা তাদের ঘাঁটি খালি করে হোটেলে গিয়ে উঠেছে, ফলে বেসামরিক লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।’

মানব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের সম্ভাবনা
বিশ্লেষকদের মতে, হোটেলে হামলার ধরন দেখে মনে হয় এটি শুধু স্যাটেলাইট নজরদারির ফল নয়; এর পেছনে মানব গোয়েন্দা তথ্যও থাকতে পারে।

গ্রাজেভস্কির মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের একটি বড় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক রয়েছে—যা এই ধরনের হামলা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে