শনিবার । মে ২, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক লাইফস্টাইল ২ মে ২০২৬, ৮:২৯ অপরাহ্ন
শেয়ার

প্রকৃতি না পরিবেশ—ব্যক্তিত্ব গঠনে কোনটি বেশি প্রভাব ফেলে?


personality

বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, ব্যক্তিত্ব গঠনে জিন ও পরিবেশ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে কোনো একটিই এককভাবে নির্ধারক নয়

ব্যক্তিত্ব কি জন্মের সময়ই নির্ধারিত হয়ে যায়, নাকি জীবনের অভিজ্ঞতা আমাদের গড়ে তোলে—এই প্রশ্ন বহুদিনের। নতুন গবেষণা বলছে, বিষয়টি আসলে অনেক বেশি জটিল।

২০০৯ সালে ইতালির ট্রিয়েস্তে শহরে এক হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত আবদেলমালেক বায়াউতের আইনজীবী এক ব্যতিক্রমী যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, তার মক্কেলের ডিএনএতে তথাকথিত ‘ওয়ারিয়র জিন’ রয়েছে, যা আক্রমণাত্মক আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আদালত এই যুক্তি আংশিকভাবে গ্রহণ করে তার সাজা এক বছর কমিয়ে দেয়।

১৯৯০-এর দশক থেকে বিজ্ঞানীরা MAOA নামের একটি জিনের ভিন্নতা ও সহিংস আচরণের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেতে শুরু করেন। তবে বর্তমানে গবেষণা বলছে, কোনো একক জিন মানুষের আচরণ নির্ধারণ করে—এমন ধারণা ভুল।

নেদারল্যান্ডসের গবেষক আইসু অকবাই বলছেন, ‘আগে মনে করা হতো কয়েকটি জিনই আচরণ নির্ধারণ করে। এখন আমরা নিশ্চিত, বিষয়টি এত সরল না। অনেক বেশি জটিল।’

জিন বনাম পরিবেশ: কতটা প্রভাব?
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিত্বের প্রায় ৪০% থেকে ৫০% জেনেটিক বা বংশগত প্রভাবের কারণে গড়ে ওঠে। বাকি অংশ নির্ভর করে পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ওপর।

ব্যক্তিত্ব সাধারণত পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করা হয়—উন্মুক্ততা, সচেতনতা, বহির্মুখিতা, সহানুভূতিশীলতা এবং মানসিক অস্থিরতা (নিউরোটিসিজম)।

তবে যমজদের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, একই ডিএনএ থাকা সত্ত্বেও তাদের ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি এক হয় না। অর্থাৎ, পরিবেশের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।

‘জিম টুইনস’
১৯৭৯ সালে মনোবিজ্ঞানী থমাস বুশার্ড আলাদা হয়ে বড় হওয়া যমজদের নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি এমন দুই যমজ ভাইকে খুঁজে পান, যারা আলাদা বড় হলেও জীবনের অনেক দিকেই বিস্ময়করভাবে মিল ছিল—দুজনই ‘লিন্ডা’ নামের নারীকে বিয়ে করেছিলেন, পরে ‘বেটি’ নামের আরেকজনকে বিয়ে করেন, এমনকি তাদের সন্তানের নামও প্রায় একই ছিল।

তবে সমালোচকরা বলেন, এ ধরনের মিল কাকতালীয়ও হতে পারে।

‘মিসিং হেরিটেবিলিটি’ রহস্য
মানব জিনোমে প্রায় ৩ বিলিয়ন বেস পেয়ার রয়েছে, যার মাত্র ০.১% আমাদের ভিন্নতা তৈরি করে। কিন্তু এই ভিন্নতার সুনির্দিষ্ট প্রভাব খুঁজে বের করা কঠিন।

নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তিত্ব ‘পলিজেনিক’—অর্থাৎ হাজার হাজার ছোট জেনেটিক ভ্যারিয়েশন মিলেই ব্যক্তিত্ব গঠন করে। তবে এই জিনগুলোর সম্মিলিত প্রভাবও প্রত্যাশার চেয়ে কম।

পরিবেশের ভূমিকা কতটা?
শুধু জিন নয়, পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ—তবে সেটিও সরল নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে:
বড় কোনো ঘটনা (যেমন দুর্ঘটনা বা লটারি জেতা) ব্যক্তিত্বে বড় পরিবর্তন আনে না
শৈশবের অভিজ্ঞতা কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে
প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের ট্রমা তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ‘বড় কোনো ট্রমা ঘটলেও তা ব্যক্তিত্বে বড় ছাপ ফেলে না।’

জন্মের আগের প্রভাব
গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক চাপ শিশুর স্বভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—একে বলা হয় ‘ফিটাল প্রোগ্রামিং’। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি মানসিক চাপের মধ্যে থাকা মায়েদের শিশুদের মধ্যে ভয় ও দুঃখের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, ব্যক্তিত্ব গঠনে জিন ও পরিবেশ—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে কোনো একটিই এককভাবে নির্ধারক নয়। বরং হাজারো ছোট জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং অসংখ্য ছোট অভিজ্ঞতা মিলেই আমরা যেভাবে মানুষ হয়ে উঠি, তা তৈরি হয়।

তবে এ নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের জেনেটিক গবেষণা হয়তো এই জটিল সম্পর্ককে আরও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে।