মঙ্গলবার । এপ্রিল ২৮, ২০২৬
ইন্টারন্যাশনাল ডেস্ক আন্তর্জাতিক ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১:০৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার

পারমাণবিক আলোচনা স্থগিত রেখে নতুন প্রস্তাব ইরানের


abbas-araghchi

ইরান ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার লক্ষ্যে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী পর্যায়ে ঠেলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আঞ্চলিক সমর্থন নিশ্চিত করতেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তিন দেশে ৭২ ঘণ্টার এক তৎপর কূটনৈতিক সফর চালিয়েছেন।

সোমবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন আরাঘচি। এর আগে তিনি দু’দিনে দুইবার ইসলামাবাদ সফর করেন এবং ওমানের মাস্কাটেও বৈঠকে অংশ নেন। মাস্কাটের আলোচনায় বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে।

মাস্কাটে মূলত হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। পারমাণবিক ইস্যু আপাতত আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে।

ইরান তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব পাকিস্তানের কাছে জমা দিয়েছে, যারা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করছে। এর আগে ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি আলোচনায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

হোয়াইট হাউস এ প্রস্তাবের বিস্তারিত নিশ্চিত করেনি। মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মিডিয়ার মাধ্যমে আলোচনা করবে না এবং এমন কোনো চুক্তি করবে না যা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ দেয়।

অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান জানে কী করতে হবে। তারা পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না—তা না হলে আলোচনার কোনো প্রয়োজন নেই।’

বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা একটি সময়সীমার মধ্যেই চলছে। ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে হলে ট্রাম্পকে ১ মে’র মধ্যে নিজের দেশের কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হবে।

মধ্যস্থতায় পাকিস্তান
ইসলামাবাদ সফরে আরাঘচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে বৈঠক করেন।

তিনি সামাজিক মাধ্যমে জানান, পাকিস্তান সাম্প্রতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত দাবি আলোচনায় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন।

আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি
গত তিন দিনে কাতার, সৌদি আরব, মিসর ও ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন আরাঘচি। কাতার সতর্ক করে বলেছে, সমুদ্রপথকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার করা উচিত নয়।

গালফ অঞ্চলের দেশগুলো ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক হামলায় ক্ষুব্ধ হলেও, তারা কূটনৈতিক সমাধানের পথেই থাকতে চায়—শর্ত হলো ইরান যেন ভবিষ্যতে তাদের ওপর হামলা না চালায়। এদিকে হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় তাদের জ্বালানি রপ্তানি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রাশিয়ার ভূমিকা
আরাঘচির মস্কো সফরে যুদ্ধবিরতি, আলোচনা এবং ইউরেনিয়াম ইস্যু নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া কূটনৈতিক সহায়তা দিতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে না।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর ইরান আঞ্চলিক সমর্থনহীন হয়ে পড়ে। এবার তাই বৃহত্তর কূটনৈতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তেহরান। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে ভেঙে না পড়ে।

তবে সবকিছুই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না তার ওপর। ট্রাম্প ইতোমধ্যে বলেছেন, ইরানের প্রস্তাব যথেষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালিকে এখনো একটি কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায় না হওয়া পর্যন্ত এটি চালু নাও করতে পারে।

এদিকে সামনে হজ মৌসুম ঘনিয়ে আসছে, যা সৌদি আরবের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পাকিস্তানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনার আরেকটি পর্ব আয়োজনের জন্য তারা প্রস্তুত থাকলেও, প্রকৃত আলোচনা আপাতত পর্দার আড়ালেই চলবে।