
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একটি অপরিহার্য নাম। তিনি একদিকে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া থেকে শুরু করে পুরো যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নেতা, অন্যদিকে সামরিক শাসনের সঙ্গে জড়িত একজন সেনা প্রধান। আবার তিনি নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিও হয়েছেন। এই দ্বৈত পরিচয়ই তাকে নিয়ে আলোচনার মূল। কারও কাছে তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক, বিরোধীরা তাকে একজন সেনাশাসক হিসেবে চিত্রায়িত করতে চান। এই দুইয়ের মাঝখানেই আটকে আছে জিয়াকে বোঝার চেষ্টা। ফলে তাকে পড়া হয়ে ওঠে খণ্ডিতভাবে—কারও পছন্দের জায়গা থেকে বা বিরাগের জায়গা থেকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে কি তাকে বোঝা সম্ভব নয়? তাকে কি এক নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংকটের নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা যায় না? এই লেখার চেষ্টা সেটাই—জিয়াকে ভালো বা খারাপ বানানো নয়, বরং তাকে বোঝা, তার সিদ্ধান্ত ও প্রভাবের প্রেক্ষাপটে।
অস্থির সময়ের নেতা
১৯৭৫–পরবর্তী বাংলাদেশ ছিল অস্থির। রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়েছিল, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট ছিল, সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভাজন ছিল, অর্থনীতি দুর্বল, সামাজিক অস্থিরতা বেশি। এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান ইতিহাসের কেন্দ্রে চলে আসেন। তিনি কোনো পরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল নেননি; বরং পরিস্থিতি তাকে তৈরি করেছে, আর তিনি পরিস্থিতিকে রূপ দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি, কারণ পরিস্থিতি মানুষকে পরিচালিত করে, মানুষও পরিস্থিতিকে রূপ দেয়। জিয়া ছিলেন সেই সময়ের সন্তান, ইতিহাসের একটি বিকল্প পথের প্রতিনিধি।

সেনাশাসক না রাষ্ট্রনায়ক?
জিয়ার সেনাশাসকের পরিচয় এড়ানো যায় না। তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন এবং ক্ষমতায় এসেছিলেন সেনা-সমর্থিত প্রক্রিয়ায়। তবে সব সেনাশাসক একরকম নয়। সব সামরিক শাসন একই রকম হয় না। জিয়া সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আইন আরোপ করেননি, বরং রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন, নির্বাচনের আয়োজন করেছেন, সংবিধানে সংশোধন এনেছেন। এসব পদক্ষেপকে কেউ কৌশল বলবেন, কেউ বলবেন আত্মরক্ষা, আবার কেউ বলবেন বৈধতা পাওয়ার চেষ্টা। সব ব্যাখ্যাই সম্ভব। তবে সবচেয়ে বড় সত্য—তিনি রাজনীতিকে বাদ দেননি।
রাষ্ট্রনায়ক শব্দটি ভারী। এটি ইতিহাস দিয়ে মাপা হয়। জিয়া কি সত্যিই রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন, নাকি কেবল ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা করেছিলেন? কিছু প্রশ্ন হয়তো তোলা যায়। তিনি কি রাষ্ট্রকে একটি স্থিতিশীল কাঠামো দিতে চেয়েছিলেন, নাকি শুধুমাত্র নিজস্ব ক্ষমতা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন, নাকি উভয়ই? জিয়ার কিছু সিদ্ধান্ত দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। যেমন, গ্রামকেন্দ্রিক উন্নয়ন, খাল খনন, মানবসম্পদ রপ্তানি, গার্মেন্টেসের বিকাশ, উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি করেন। এটি রাজনৈতিকভাবে কৌশলী ছিল এবং বিরোধীদের কাছে সমালোচিতও। কেউ বলবে এটি পাকিস্তানপন্থী মনোভাবকে মোকাবিলা করার একটি প্রয়াস, কেউ বলবে এটি ক্ষমতার রাজনৈতিক রূপ। কিন্তু এটা সত্য—তিনি একটি নতুন রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

সাধারণ মানুষের নেতা
জিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা। তিনি সরল বাক্য ব্যবহার করতেন, নিজেকে কোনো এলিট রাজনীতিক হিসেবে উপস্থাপন করতেন না। মানুষ সেটি গ্রহণ করেছিল, বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। তিনি স্বনির্ভরতা ও উন্নয়নের কথা বলতেন, নিরাপত্তার কথা বলতেন, শৃঙ্খলার কথা বলতেন। ৭০–এর দশকের বাংলাদেশে এসব বার্তা শক্তিশালী ছিল। এটি কেবল ইমেজ রক্ষার জন্য নয়, বরং তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও অংশ ছিলো।
তবে কিছু দুর্বলতাও ছিল। তিনি গণতন্ত্রকে পুরোপুরি শক্ত করতে পারেননি। সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা খুব বেশি কমাতে পারেননি। ক্ষমতার কেন্দ্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছিল। এটি সবচেয়ে বড় সমালোচনা। কারণ গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; এটি প্রতিষ্ঠানকে শক্ত করার নাম। সেখানে জিয়া সীমাবদ্ধ ছিলেন। হয়তো এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে যত সময় দরকার তা তিনি পাননি।
ইতিহাসে প্রতীক হয়ে ওঠা
বাংলাদেশে জিয়াকে কঠোরভাবে দেখা হয়। কারণ ইতিহাস এখানে দলীয়, নিরপেক্ষ নয়। এক দল তাঁকে নায়ক বানায়, অন্য দল তাঁকে অস্বীকার করে। ফলে মাঝামাঝি ভারসাম্যের জায়গা হারিয়ে যায়। জিয়া হয়ে ওঠেন প্রতীক, মানুষ নয়। কিন্তু ইতিহাসে মানুষই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মানুষ ভুল করে। মানুষের সীমাবদ্ধতাও থাকে। জিয়াও তাই, একজন মানুষ হিসেবে সীমিত। তাই তাকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে মানবিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে।

রাষ্ট্রনায়ক বনাম সেনাশাসক—এই বাইনারি থেকে বেরিয়ে তাকে পড়তে হবে একটি সংকটকালীন নেতৃত্ব হিসেবে। একজন ট্রানজিশনাল ফিগার হিসেবে, স্বাধীনতার পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনের একটি ধারা হিসেবে। তার অবদান আছে, সীমাবদ্ধতাও আছে। দুটোই একসাথে। তবে তার সময়ের বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে তাকে বোঝার চেষ্টা করলে আমরা আরও সম্যকভাবে তার চরিত্র ও নীতি দেখতে পারি।
প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে আজও
আজকের বাংলাদেশে জিয়া কেন প্রাসঙ্গিক? কারণ আজও আমরা একই প্রশ্নের মুখোমুখি—ক্ষমতা বনাম গণতন্ত্র, নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতা, রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি। জিয়ার সময়েও এই দ্বন্দ্ব ছিল। তিনি যেভাবে তা সমাধান করার চেষ্টা করেছিলেন, সেটি সফল হয়েছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তবে প্রশ্নগুলো এখনও জীবিত। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেবল নৈতিকতা বা ক্ষমতার সমষ্টি নয়; এটি একটি সংকটকালীন বাস্তবতা, যেখানে সিদ্ধান্তের জটিলতা বোঝা জরুরি।
সবমিলিয়ে বলা যায়, জিয়াউর রহমানকে একতরফাভাবে ভালোবাসা বা একতরফাভাবে অপছন্দ—দুটোর বাইরে একটি জায়গা দরকার। সেই জায়গা হলো বোঝার জায়গা। তিনি হয়তো শতভাগ নিখুঁত রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন না, আবার কেবল সেনাশাসকও ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইতিহাসের সন্তান, একটি অস্থির সময়ের নেতা। তাঁকে সেইভাবেই পড়তে হবে। তাহলেই ইতিহাস থেকে আমরা কিছু শিখতে পারবো। নইলে ইতিহাস আমাদের কাছে কেবল স্লোগান হয়ে থাকবে।









































