সোমবার । মার্চ ৯, ২০২৬
বাংলা টেলিগ্রাফ ডেস্ক আন্তর্জাতিক ৯ মার্চ ২০২৬, ৪:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শক্তি ও দুর্বলতা


Mojtoba Khameni

তাকে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা ইরানের পক্ষ থেকে এক ধরনের প্রতিরোধের বার্তা

ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় পর দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যেই রোববার ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ ঘোষণা দেয় যে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনিই দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা।

ইরানের বিরোধী ঘরানার টেলিভিশন চ্যানেল ইরান ইন্টারন্যাশনাল দাবি করেছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–এর সমর্থনেই তাকে এই পদে আনা হয়েছে। তাকে ইরানের রাজনীতিতে একজন কঠোরপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যেই তাকে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করা ইরানের পক্ষ থেকে এক ধরনের প্রতিরোধের বার্তা। একই সঙ্গে এটি তার বাবার হত্যার প্রতিক্রিয়া এবং আপসের আহ্বানের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

জন্ম ও শুরুর জীবন
মোজতবা খামেনির জন্ম ১৯৬৯ সালে ইরানের মাশহাদ শহরে। তিনি ছিলেন আলি খামেনি ও মনসুরেহ খোজাস্তেহ বাঘেরজাদেহ দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে। তার মা-ও গত সপ্তাহে হামলায় আহত হওয়ার পর মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

তার জন্মের সময় ইরানে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর শাসন চলছিল। পরে ১৯৭৯ সালে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মাধ্যমে সেই শাসনের পতন ঘটে এবং ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আলি খামেনি ও আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির।

যুদ্ধ ও সামরিক সংযোগ
মোজতবা খামেনির কৈশোর কেটেছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়, যে সংঘাতে প্রায় ১০ লাখ ইরানি নিহত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। যুদ্ধের শেষদিকে তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে যুক্ত হন।

আইআরজিসির স্বেচ্ছাসেবী সংযুক্ত ইউনিট হাবিব ইবনে মাজাহির ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন পরবর্তীতে আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান হওয়া হোসেইন তাইয়েব।

ক্ষমতার অন্দরমহলে প্রভাব
মোজতবা খামেনি সাধারণত জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন। তিনি কুম শহরে শিক্ষকতা করতেন এবং কখনোই কোনো সরকারি পদে ছিলেন না।

তবে পর্দার আড়ালে তার প্রভাব অনেক বেশি ছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়।

২০০০ সালের দশকের শুরুতে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে ওঠেন। ২০০৯ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এবং পরবর্তী বিক্ষোভ দমনে তার ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ উঠেছিল।

২০০৯ সালে এক ইরানি রাজনীতিক দ্য গার্ডিয়ান-কে বলেন, বিক্ষোভ দমন অভিযানে বাসিজ বাহিনী নাকি মোজতবার নির্দেশেই কাজ করছিল, যদিও তার নাম প্রকাশ্যে কখনো উল্লেখ করা হতো না।

সম্পদ নিয়ে বিতর্ক
মোজতবা খামেনির সম্পদ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। ব্লুমবার্গ-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, শেল কোম্পানির মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে তার প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে।

উত্তর লন্ডনের ‘বিলিয়নিয়ার্স রো’ নামে পরিচিত বিশপস অ্যাভিনিউতে তার ১১টি সম্পত্তি থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এছাড়া তেহরান, দুবাই ও ফ্রাঙ্কফুর্টেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিতর্কিত নির্বাচন
অনেকের মতে, মোজতবা খামেনির সর্বোচ্চ নেতা হওয়া ইরানের রাজনীতিতে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। কারণ তিনি পূর্ববর্তী নেতার ছেলে হওয়ায় কেউ কেউ এটিকে বংশগত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক সময় রাজতন্ত্র উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছিল, সেখানে এই বিষয়টি সংবেদনশীল।

এছাড়া তিনি কখনো সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেননি—এটিও সমালোচনার একটি কারণ।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তেহরান টাইমস-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, আলি খামেনি নিজেই নাকি তার ছেলের উত্তরসূরি হওয়ার ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন।

প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, কিছু বিশ্লেষকের মতে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানে “বংশগত ক্ষমতা হস্তান্তরের” ধারণা তুলে ধরে দেশটির রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করে।

তবে বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কীভাবে গড়ে উঠবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিতভাবে কিছু বলা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে