
দুটি বড় ভুল হিসাব—ইরানে দ্রুত শাসন পরিবর্তনের আশা এবং হিজবুল্লাহকে দুর্বল ভাবা—এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদে জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে
দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে যে এই যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দুটি বড় ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল।
একটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের—ইরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত ভেঙে ফেলার সম্ভাবনা নিয়ে। অন্যটি ইসরায়েলের—হিজবুল্লার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘‘আমরা যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নিতাম, কয়েক মাসের মধ্যেই ইরানের ‘মৃত্যু শিল্প’ যেকোনো হামলার বাইরে চলে যেত।” তিনি দাবি করেন, এই অভিযান ইরানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন থেকে বিরত রাখবে এবং একই সঙ্গে ইরানের জনগণকে সরকার পতনে উৎসাহিত করবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই হামলা একটি সম্ভাব্য পারমাণবিক যুদ্ধ ঠেকিয়েছে।
শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য: যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসাব
নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের বক্তব্য সত্ত্বেও, বিশ্লেষকদের মতে এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানে শাসন পরিবর্তন। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অনেকটাই ধ্বংস করেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে আবার বড় ধরনের হামলা চালানো—এই প্রশ্ন তুলছে, কী বদলেছে?
উত্তরটি সম্ভবত উদ্দেশ্যে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে থাকা নেতানিয়াহুর জন্য এটি একটি রাজনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্য। তবে একা ইসরায়েলের পক্ষে তা সম্ভব নয়—তাই যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছিল, ২০২৩ সালের পর থেকে ইরান ও তার মিত্রদের দুর্বলতা—বিশেষ করে গাজায় হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহর ক্ষয়ক্ষতি, এবং সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতন—ইরানে শাসন পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্র বলছে, তীব্র বোমাবর্ষণ সত্ত্বেও ইরানের সরকার ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণ নেই। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের সরকারবিরোধী আন্দোলনও দেখা যায়নি।
এমনকি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মোজতবা খামেনিকে নেতৃত্বে আনা হয়েছে—যা প্রমাণ করে রাষ্ট্রযন্ত্র এখনো কার্যকর।
এর পাশাপাশি, ইরান পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চল ও ইসরায়েলে ক্ষয়ক্ষতি করছে, মার্কিন স্বার্থেও আঘাত হানছে। এমনকি ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ শুরু করায় বিশ্ব জ্বালানি বাজার বড় সংকটের মুখে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরানের সরকার টিকে যায়, তাহলে এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের জন্য বড় ধাক্কা হবে এবং রাশিয় ও চীন এর সুযোগ নিতে পারে।
এই যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপরও পড়ছে। সৌদি আরব, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত ও কুয়েত—এসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি থাকা সত্ত্বেও তারা ক্ষতির মুখে পড়ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, এসব ঘাঁটি আসলেই নিরাপত্তা দিচ্ছে নাকি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই যুদ্ধের জনপ্রিয়তা কম। অনেকের মতে, ইসরায়েলই যুক্তরাষ্ট্রকে এই সংঘাতে জড়িয়েছে।
১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকটের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, তখনও ইসরায়েল, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সামরিকভাবে সফল হলেও রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। মিশরের নেতা গামাল আবদেল নাসের বরং আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন।
একইভাবে, ইরান যদি এই যুদ্ধ টিকে যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
হিজবুল্লাহ ফ্যাক্টর: ইসরায়েলের ভুল হিসাব
ইসরায়েল ধারণা করেছিল, হিজবুল্লাহ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাদের নেতা হাসান নাসরাল্লাহ শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতির পর তাদের নীরবতা—সব মিলিয়ে এই ধারণা তৈরি হয়।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। হিজবুল্লাহ দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইসরায়েলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত করছে এবং উত্তরাঞ্চল প্রায় অচল করে দিয়েছে।
এর ফলে ইসরায়েল এখন দুই ফ্রন্টে যুদ্ধ করছে—ইরান ও লেবানন সীমান্তে।
নিরাপত্তা আশ্রয়ে ছুটে যাওয়া সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—এই যুদ্ধের লক্ষ্য কী এবং কতদিন চলবে?
২০২৩ সালের গাজা যুদ্ধের মতোই শুরুতে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা কমতে পারে।
নেতানিয়াহু দাবি করছেন, এই যুদ্ধ ইসরায়েলকে “বিশ্বশক্তি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান টিকে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দেয়, তাহলে এই সংঘাত উল্টো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—উভয়ের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধের মূল ভিত্তিতে থাকা দুটি বড় ভুল হিসাব—ইরানে দ্রুত শাসন পরিবর্তনের আশা এবং হিজবুল্লাহকে দুর্বল ভাবা—এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদে জটিল ও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইরান টিকে থাকলে, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
মিডল ইস্ট আই





































