বুধবার । এপ্রিল ২৯, ২০২৬
ড. শরিফুল ইসলাম দুলু মতামত ১২ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার

বাংলাদেশের রাজনীতির সংকীর্ণ চরিত্র: দলীয় আনুগত্য এবং গোত্রভুক্ত রাজনীতি যেখানে মুখ্য


Dulu bhai

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত আন্দোলন, আত্মত্যাগ আর গণমানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণঅভ্যুত্থান কিংবা মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি ধাপে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে বড় ছিল একটি সম্মিলিত জাতীয় লক্ষ্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর সময় যত এগিয়েছে, রাজনীতির চরিত্র তত সংকীর্ণ হয়েছে। আদর্শের জায়গা দখল করেছে দলীয় আনুগত্য, আর জাতীয় স্বার্থের জায়গায় বসেছে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর হিসাব।

আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট ক্ষমতার অভাব নয়, বরং আস্থার অভাব। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ দলীয়করণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাও দলীয় পরিচয়ের ছায়া থেকে মুক্ত নয়। এর ফলাফল স্পষ্ট— গণতন্ত্র দুর্বল, নাগরিক অধিকার অনিশ্চিত, এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ।

এখানে একটি তথ্য মনে রাখা জরুরি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে যেসব রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মেরুকরণ বেশি, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি গড়ে ১.৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বাংলাদেশ গত এক দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে অগ্রগতি দেখালেও রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতির কারণে মানব উন্নয়ন সূচক, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।

দলীয় রাজনীতির সমস্যা তখনই মারাত্মক হয়, যখন তা গোত্রভিত্তিক রূপ নেয়। গোত্রভিত্তিক রাজনীতি মানে এখানে রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ক— যেখানে পদ, সুযোগ আর নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় আনুগত্যের ভিত্তিতে। এতে করে যোগ্যতা মূল্যহীন হয়ে পড়ে, আর রাষ্ট্র পরিণত হয় পুরস্কার বিতরণের যন্ত্রে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ভোটার উপস্থিতি, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহ— সবকিছুতেই ভাটা পড়েছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, নগরের তরুণদের প্রায় ৬০ শতাংশ রাজনীতিকে “দূষিত” এবং “অকার্যকর” মনে করে। এই মানসিকতা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক, কারণ রাজনীতি থেকে তরুণদের বিচ্ছিন্নতা মানে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের শূন্যতা।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন একটাই— উত্তরণ কোথায়?
উত্তরণ শুরু হয় মানসিক রূপান্তর থেকে। দল থাকবে, মত থাকবে, বিরোধ থাকবে—এটাই গণতন্ত্র। কিন্তু দল রাষ্ট্রের বিকল্প হতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকবে— এই মৌলিক নীতিতে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও স্বাধীন না করলে রাজনৈতিক পরিবেশ কখনোই সুস্থ হবে না।

এখানে আরেকটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাপী যেসব দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তুলনামূলক বেশি— যেমন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা ভিয়েতনাম—সেখানে আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশেও একই পথ ছাড়া বিকল্প নেই।

দল আর গোত্রমুক্ত রাজনীতির অর্থ দল নিষিদ্ধ করা নয়, বরং দলকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধে আবদ্ধ করা। রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্র টেকসই হয় না। নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছতা, নীতিনির্ধারণে জবাবদিহি এবং অর্থায়নে স্বচ্ছতা—এই তিনটি জায়গায় সংস্কার জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নাগরিককে কেন্দ্রে আনা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা—এই মৌলিক বিষয়গুলো দলীয় প্রচারের বাইরে এনে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজনীতির প্রশ্ন হবে—দেশ কী পেল, দল কী পেল সেটা নয়।

বাংলাদেশ বিনির্মাণ মানে শুধু অবকাঠামো নয়। এটা প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা এবং আস্থার নির্মাণ। এটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কিন্তু অসম্ভব নয়। ইতিহাস বলে, বাঙালি সংকটে ঐক্যবদ্ধ হতে জানে। প্রয়োজন শুধু একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার—দল আগে নয়, বাংলাদেশ আগে।

এই অঙ্গীকার যদি রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং পেশাজীবীরা সম্মিলিতভাবে ধারণ করে, তাহলে দল আর গোত্রমুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ কোনো স্লোগান থাকবে না। সেটা হবে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বাস্তব ভিত্তি।

বাংলাদেশের সামনে এখন সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। আমরা কি বিভক্ত পরিচয়ের রাজনীতিতে আটকে থাকব, নাকি একটি দায়িত্বশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্র নির্মাণে এগোব। উত্তর ইতিহাস দেবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে—এখানে, এখন।

ড. শরিফুল ইসলাম দুলু: বিপণন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, নীতি পরামর্শক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (এমআইবি)-এর সেক্রেটারি জেনারেল এবং মার্কটেল কনসাল্টিং গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা

[এই বিভাগের মতামত লেখকের নিজস্ব]